কোন ছেলেটা? সেই ছেলেটা...

২০১৩তে Rush বলে একটা সিনেমা বেরোয়। সিনেমাটা F1 রেসিংএর স্বর্ণযুগ, মানে ওই ধরুন ১৯৭০-৮০, ওই সময়কার দুই বিশ্বজয়ী ড্রাইভার James Hunt আর Nikki Laudaর মধ্যের চরম প্রতিদ্বধীতাটা অসাধারণ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে| সিনেমাটা যতবার দেখি আমার ব্যক্তিগত জীবনে একজনের কথাই মনে পড়ে| চারিদিকে সবাই তো বন্ধুতের গল্প লিখছে, চলুন আপনাদের একটা শত্রুতার গল্প শোনাই|

১৯৯৫ সাল তখন প্রথম দিন স্কুলের... ছল ছল চোখে আমি মায়ের হাত ছেড়ে ক্লাসে গিয়ে বসলাম, প্রথম দিন তাই একটু তাড়াতাড়ি স্কুলে পৌঁছেছিলাম, গিয়ে দেখি লাস্ট বেঞ্চে বসে একটা ছেলে ঘুমাচ্ছে। কিছু লোক থাকে না যাদের শুধু মুখ দেখলেই মনে হয় যে এদের সাথে জমবে না, আমারও সেই প্রথম দেখাতেই ঘৃণা। পাত্তা না দিয়ে মুখে আঙুল পুরে বসে গিয়েছিলাম, ও লাস্ট বেঞ্চ আমি ফার্স্ট বেঞ্চ।

মাঝে একদিন টিফিনে খেলতে গিয়ে আমার নাকে কামড়ে দিয়েছিল, ব্যাস আমাদের মধ্যের cold war রিতীমত hot হয়ে ওঠে। ব্যাপারটা বাবা মা পর্যন্ত গড়ায়।
সারাদিন ডানপিটেমি করে বেড়াতো, আমি তখন  teacher's boy।
প্রথম পরীক্ষার আগে মোটামুটি sure ফার্স্ট হবই। খাতা দেখাতে হতবাক, আমি ফার্স্ট ও সেকন্ড তাও কিনা ৫ নাম্বার কেটেছে ও লেখার সময় লাইনের ধারধারেনি বলে।
ওটাই সুত্রপাত ওর আর আমার মধ্যের চরম competitionএর। এরপর হয় ও ফার্স্ট, আমি সেকন্ড নয়তহ উল্টোটা। যখনি আমি ফার্স্ট হতাম ওর মা আমাদের বাড়ীর উঠোনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলত কেমন করে টিচাররা ইচ্ছা করে আমায় পরীক্ষায় বেশী নাম্বার দিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবে আমার মা বাবাও ছেড়ে দেবার পাত্র নন। Parents teachers meetingএ তারাও নেমে পরতেন নিজেদের সুপুত্রের ডিফেন্সে।

যত বড় হচ্ছিলাম ঝগড়াটা কি নিয়ে শুরু হয়েছিল ভুলে গেলেও ঝগড়াটা যে চলছিল সেটা মনে ছিল... মাঝে একবার মনে হয়েছিল, কি বাচ্চাদের মতন ঝগড়া করছি মিটমাট করে নি। summer vacationএ গিয়েছিলাম ব্যাট হাতে ওকে খেলতে ডাকতে। দরজা খোলার পর এক গাল হেসে বলেছিল "চল আমাদের ছাদেই খেলি।"

আগেই বলেছি ভীষণ ডানপিটে ছিল পাশের বাড়ীর ছাদে বল গেলে তিনতলার ওপর ছাদ থেকে পাশের বাড়ীর ছাদে ঝাঁপ দিয়ে বল নিয়ে আসত। একদিন বল দেয়নি, শুনেছিলাম রাত্রে গিয়ে ও বাড়ীর ছাদে গিয়ে ইয়ে করে দিয়ে এসেছিল।
summer vacation শেষ, রেসাল্ট বেরল আমি ফার্স্ট ও সেকন্ড। ব্যাস পরের দিন খেলতে গেলাম ,দরজা খুললো ওর মা, বাড়ী থেকে দিল বার করে।

তারপর আর কি চোখের জলে প্রতিজ্ঞা জীবনে আর ওই পাড়ায় মুখ দেখাব না।
sorry, ক্ষমা ও কোন দিনই কারুর থেকে চায়নি আমাকেও কিছু বলল না, বলতে হয়ত চেয়েছিল কিন্তু আমিও তো কম জেদি নই ,পাত্তা দিইনি। সেদিন থেকে ও invisible হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে।

রেষারেষি চলল আবার, ও house captain আমি school captain, ও ভলি বলে নাম দিল আমাকেও দিতে হবেই। তারপর খেলতে না পেরে কিভাবে প্যান্ট ফাটিয়ে বাড়ী ফিরেছিলাম সেটা অন্য ইতিহাস।
বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না... ব্যাপারটা প্রেম পর্যন্ত গড়ায়। স্কুলে আমার কাউকে পছন্দ হলে ও তাকে (চলতি ভাষায়) লাইন মারবে, আর ওর কাউকে পছন্দ হলে আমি তো আছিই। এমন নয় যে আমারা দুজনেই খুব বীর হনু ছিলাম, পাত্তা দুজনকেই কেউ দিত না, তাও প্রেম ফ্রেম বুঝিনি আমাদের প্রেম নির্ভর করত অন্য জনের টার্গেটে কে আছে।

ওই ব্যাট ঘটনার পর থেকে কথাবার্তা বন্ধ ...  তখন ক্লাস ৮এর ফাইনাল পরীক্ষা চলছে, পরীক্ষার আগের দিন maths বই হারিয়েছি, ভয়ের চোটে বাড়ীতে বলতে পারছি না, কাছাকাছি কয়েকজন বন্ধুকে বললাম, কেউ বই দিতে রাজি নয়। হাল ছেড়ে যখন জীবনে প্রথমবার ফেল করে কোন রাস্তা দিয়ে বাড়ী ছেড়ে পালাবো সেটা ভাবছি হঠাৎ শুনি জানলায় টক্ টক্, জানলা খুলে দেখি ও দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই বলল
"আমার পড়া হয়ে গেছে, তুই পড়ে নে।"
বইটা নেব না বা তোর বই আমার চাইনা সেটা বলার সময়ও দেয়নি, যেমন এসেছিল তেমনি পাঁচিল টপকে চলে গেল।
ও নিজেও জানত আমার বাড়ীর লোক দেখলে ওকে অতিথি দেব ভব্ করে বসাবে না।
আমায় বাড়ী থেকে বের করে দেওয়াটা আমার থেকে বেশী আমার বাড়ীর লোক গায়ে মেখেছিল। পরীক্ষায় ভাল ভাবেই পাস করেছিলাম। লাস্ট বেঞ্চেও আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল আমার কাছে।
ক্লাস ১০এর ICSE পরীক্ষা, ও তখন নতুন প্রেম করছে, আমি আমাদের নতুন পাওয়া বন্ধুতের খাতিরে ওর বান্ধবীর প্রতি কোন চেষ্টা চালাইনি। ও প্রেমে মসগুল হয়ে ICSEটা ডুবিয়েছিল, সেবার আমি বিনা প্রতিদন্ধিতায় স্কুল টপার।

আমাদের স্কুল থেকে আমাদের দুজনকে অন্য স্কুলে science quizএর জন্য পাঠানো হয়। Quizটা ছিল বেহালায়। শুরুর একটু আগে বলে ৫মিনিটে আসছি।  ভাবলাম হয়তহ সিগারেট খেতে গেছে, ততদিনে ও সব নেশাই ধরে ফেলেছে। ৫মিনিট গেল, ১০মিনিট গেল ওর পাত্তাই নেই এদিকে নাম ঘোষণা হয়ে গেছে... আমাদের ম্যাচটা ওয়াকওভার দিতে হয়।
স্কুলে টিচার্সরা রেগে  কাঁই,  আমি তো মেরেই ফেলি। স্কুল থেকে ওকে কয়েক দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয়।

তারপর বেশ কিছুদিন  tuition coaching কথাওই ওর পাত্তা নেই, বা এলেও আর্দ্ধেক করে পালায়। একদিন ভাবলাম দেখি  কোথায়
যায়। এত ভাল ছেলে এইভাবে নষ্ট হচ্ছে সেটা নিজেরও খারাপ লাগছিল।
ওর বাড়ীর সামনে বেশ কিছুক্ষন দাড়ালাম। একটু পরে ও বেরলে আমিও পিছু পিছু চললাম। ও বেশ অন্যমনস্ক ছিল, পিছু পিছু বাসে উঠে বেহালায় নামলাম। বেশ গলি ঘুঁজি পেড়িয়ে ওই কুইজ স্কুলের একটু দূরে একটা বাড়ীর সামনে দাড়ালো।
"আমি জানি তুই পিছনে আছিস।"
বেরিয়ে এলাম "তুই পড়তে যাস না, কুইজেও ডুব মারলি, কি হয়েছে তোর?
একটু ভেবে বলে
"চল তোকে দেখাই।"

ভেতরে board দেখে বুঝলাম ওটা একটা প্রাইভেট নারসিং হোমের সাইকোলজি ওয়ার্ড , বেশ আশ্চর্য হয়েই চললাম পিছুপিছু। ও একটা রুমে নিয়ে গেল, ওর মা হস্পিটালে শুয়ে। টেবিলের সাথে হাত পা বাঁধা।
"কিছুদিন ধরেই মায়ের নার্ভের রোগটা বাড়াবাড়ি করছিল, বাইরে বেরিয়ে বাড়ী ফিরত না। একদিন রাস্তায় লোকজনের বাড়ীতে ঢিল ছোঁড়ে, বাধ্য হয়ে এখানে ভরতি। "
“কুইজের দিন ভাবলাম একবার দেখা করে আসি। মা কিছুতেই ওষুধ খেতে চাইছিল না, ওতেই দেরি হয়ে যায়।
বাবা তো কাজ ছেড়ে আসতে পারে না, তাই আমিই চলে আসি।”
"তা স্কুলে কাউকে বলিস নি কেন?"
"জানিস তো সবাই বুঝবে না, রোগটাও তো সাভাবিক নয়।"
জানতাম না কি বলব, আদেও কি কিছু বলার ছিল? সেদিন বাড়ী ফিরে রাত ৮টার সময় স্কুলে যাই। ফাদারের সাথে দেখা করে সব কথা বললাম, ওর ওপর পরেরদিন থেকে সাস্পেন্সন তুলে নেওয়া হয়।


ISC শেষে  দুজনের ছাড়াছাড়ি, আমি ফিজিক্স ও ম্যাথ্স,  আমি যাদবপুর ও প্রেসিডেন্সি। আমি পরে MBA করি, ও doctorate করে।
বহুদিন পর দেখেছিলাম ওকে, হিন্ডেলবার্গের এক বারে। আমি আমার business partnerদের সাথে ছিলাম, ও তখন এক বৃদ্ধ মহিলার সাথে খোশ গল্পে মত্ত। বিয়ে দুজনেই তখনো করিনি।

আজ এই জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে বুঝছি জীবনে যা অর্জন করেছি, নিজের চেষ্টায় ঠিকি কিন্তু ওর সাথে ঝামেলাটা থাকলে আরও অনেক বেশি কিছু করতে পারতাম, নিজের জন্য না হলেও ওকে হারানোর জন্য। স্কুলেও তাই ছিল, শেখার শখে পড়ার থেকে, ওকে হারাবার জন্য পড়াটাই আসল ছিল।
সত্যি কারের বন্ধু আর সত্যি কারের শত্রুর মধ্যে তফাৎটা ওই নোটের চকচকে দাগটার মতন, খুব খেয়াল না করলে দেখা যায় না। সারাজীবন ধরে এমন অনেক লোক দেখেছি যারা আপনাকে বাঁশ দেবে, আপনার দুর্বলাতার সুযোগ নেবে কিন্তু এমন কজন  মেলে যারা আপনার চোখে চোখ রেখে, সমানে সমানে লড়তে পারে।

orkutএর সাথেই ওর social media life শেষ.. last countএ ১৫খানা নাম্বার ছিল ওর নামে save করা, এত বছর পর একটাও লাগে না। শুনেছিলাম সংসার ছেড়ে রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দিয়েছে, এখন কোথায় আছে জানি না।

শেষ করব সেই Rushএর শেষ dialogue
"People always think of us as rivals but he was among the very few I liked and even fewer that I respected. He remains the only person I envied."

Comments

  1. বন্ধুত্ব আর শত্রুতা, ভালোবাসা আর ঘৃণা - সবই কয়েনের একটাই দিকে, অন্যদিকে থাকে নির্লিপ্ততা। চোখে চোখ রেখে ভালোবাসা আর লড়াই করা সবাই পারে না, আর হলে সেটা চিরকাল মনে থাকে।

    সেলাম ভাই, এই লেখাটা মনে থাকবে আমার।

    ReplyDelete
  2. ভালোবাসার উল্টো শব্দ ঘৃনা নয়। ভালো না বাসলে কাউকে ঘৃনা করা যায় না। ভালোবাসার উল্টো বোধহয় অবহেলা বা কিছু এসে না যাওয়া ধরনের কিছু। ঘৃনা করে তখনই কেউ, যখন যাকে ঘৃনা করছে, সে অনেক টা জায়গা জুড়ে থাকে।

    ReplyDelete
  3. অবশেষে তোমার লেখা পড়তে পারলাম ...... জীবনের অনেকটা পথ চলার পর পিছন ফিরে দেখলে বন্ধুত্বের আসল মানেটা বোঝা যায় ..... আর ঘৃণা ভালোবাসা আপেক্ষিক শব্দ মাত্র ..... ভালোলাগল এই লেখা আর লেখার সাবলীল ভাষা ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

বিশ্বাসটা বুকেই থাক

Of rooftops and marriages...

1 year - a journey worth writing about…(this blog was written by me and officially posted in Cognizant blogs)..