বিশ্বাসটা বুকেই থাক

হাঁই তুলতে তুলতে নিজের চা দোকানের ঝাঁপ খুলল  দীনু। একে এই গরম তার ওপর আবার সারারাত বোমাবাজি, শেষ কবে ভাল করে ঘুমিয়েছিল নিজেরই মনে পরে না। কাল রাতে বোমা পড়ার পর কেউ চা খেতে আসবে না জানে, তাও সারাবছরের আভ্যেস...  চায়ের গরম জল চাপিয়ে লড় ঝরঝরে রেডিওটা চালিয়ে দিল।
""... গ্রামবাসীরা সবাই হীনমন্যতায় ভুগছে। আমরা শীগগির যাচ্ছি ওখানে। আমরা ওদের সাথে আছি পাশে আছি।" আপনারা শুনলেন বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মতামত। চলে আসব পরের খবরে..."

দুদিন ধরেই দীনুর বুক ডিপডিপ করছে, গা হাতপাও কেমন জানি ম্যাজম্যাজ করছে... সত্যি কি ওর তাহলে ওর হীনমন্যতা হয়েছে? কে জানে বাবা ছোঁয়াচে নয়তহ!
এইভাবেই ঘণ্টা দুয়েক কেটে যায়। নাহ চাপটা নেওয়া যাচ্ছে না। ভরা কেটলি হাতে দীনু বেরিয়ে পরলো। কোন প্রশ্ন মাথায় এলে ও ছোটে মাস্টারের কাছে, শরীরের বিশেষ ব্যাবস্থা না করলেও মনের ব্যারাম সারিয়েই দেয়।

গ্রামের একটু দূরে মাস্টারের বাড়ী, পুরো নাম বরুন বিশ্বাস, শিক্ষকতা ছাড়াও সমাজ সেবক ছিলেন। রাজনীতির কোন রংই গায়ে মাখেননি কোনদিন, কিন্তু তাও সেই রাজনীতির কারনেই গুলি খেয়েছিলন। গুলি শরীর মন দুটোই ভেঙে দিয়েছিল, তাই এই চলে আসা, সরে আসা... কিন্তু সরে এলেই কি সরে থাকা যায়?
মাস্টার খালি গায়ে লুঙি পড়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন, খেলার পাতাটা, খবর আর দেখেন না শুধু ফুটবলের নেশাটাই কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। দীনুকে দূর থেকেই দেখতে পেয়েছিলন। ভাল ছেলে একটু বোকা, কিন্তু মনটা সরল। আসে মাঝেমধ্যে কথা বলতে...  কঠিন সমাজ দর্শন  গুলো সহজ করে বোঝাতে চেষ্টা করেন...

" মাস্টারমশাই গরমে কেমন আছো? এই চা নিয়ে এলাম তোমার জন্য।"
দীনু আপনি আজ্ঞের ধারধারে না...
"এই গরমে চা খাব কিরে, কুঁজো থেকে জল ঢাল অার টেবিলে  ORS আছে গুলে নে। গরমে বেঁচে থাকবি।"
"কি হল রোদে না দাঁড়িয়ে, ভেতরে আয়।"
"আমার না হীনমন্যতা হয়েছে, কাছে গেলে তোমারো হবে।"
মাস্টার হাসি চেপে বললেন "সে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, ভেতরে আয়"
"তা হীনমন্যতা হল কি ভাবে?"
"ওই রেডিওতে বুদ্ধিজীবী বলেছে যে গ্রামের সবার হয়েছে।"
বুদ্ধিজীবী সুশীল সমাজ, মৌন মিছিল candle light vigil সবই জনসচেতনতা বাড়াচ্ছে,  কিন্তু যাদের সচেতন হওয়া সব থেকে দরকার সেই দীনুরা হীনমন্যতায় ভুগছে। মনের শ্লেষ মনে রেখে, বললেন
"ওরে পাগল ওটা কোন রোগ নয়।"
"রোগ নয় তহ বলল কেন যে আমরা ভুগছি" গলায় আভিমান স্পষ্ট
"তোর দোকানে যারা চা খায়, তারা পয়সা দেয়?"
"হ্যাঁ, দেবে না কেন?"
"কানুও দেয়?"
"পাগল নাকি ওর থেকে কেউ পয়সা চায়"
"কেন চাইবি না?"
"কি যে বল, ওর এলাকায় কত ছেলে আছে জানো?"
"তহ?"
দীনু হা করে ভাবে মাস্টার এত বোকার মতন কথা জিজ্ঞেস করছে কেন, বেশ বিরক্ত হয়ে বলল
"আরে কেলিয়ে পাট করে দেবে। থানা পুলিশ সব ওর পকেটে।"
"সেই ভয়ে তুই তোর হকের পয়সা চাইলি না, নিজেকে ওর থেকে ছোট মনে করলি ওটাই হীনমন্যতা। যদি রুখে দাঁড়াতিস, তাহলে আর হীনমন্যতায় ভুগতিস না।"
"বেশী নাটক করলে না লাশ ফেলে দেবে। কাল রাতে বোমাগুলো শোনোনি সব ওর ছেলেদের কারসাজি। কবে যে এসব পাল্টাবে কে জানে।"
"মানুষ পাল্টালেই, পাল্টাবে।"
"এত বোমাবাজির পরও কেউ কিছু বলল না,আর তুমি বলছ  মানুষ পাল্টালেই, পাল্টাবে? তুমি ভুল করছ মাস্টারমশাই, কিছুই হবে না।"
"ভুল আমি সচরচ করি না দীনু, সব হবে। এখনো সেই tipping পয়েন্টটা আসেনি। লঙকা আছে, রাবণ রাম সবই আছে শুধু সীতাহরনটা বাকি। মানুষ এখনও সহ্য করে চলেছে, পিষে চলেছে, একদিন এমন কিছু ঘটবে যখন মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলবে অনেক হয়েছে আর না।
 all of us are equal, no one is more equal than others সেদিন এটাই সত্যি হবে, এটাই মানুষ বলবে, সেদিনটায় যদি সামিল হতে পারিস না দীনু তাহলে আর  হীনমন্যতায় ভুগবি না।....

চা তখন জুড়িয়ে জল, কেটলি হাতে দীনু অনেক আগেই উঠে গেছে। ও জানে মাস্টার এই সময় নিজেকে নিয়েই বিভর থাকবে। কথা বিশেষ বলবেও না আর যা বলবে তার বেশীরভাগ দীনু বুঝবেও না। রোদ উঠছে বাড়ীর দিকে পা চালাল, গিয়ে আবার ভাল লুঙিটা বার করতে হবে,  বুদ্ধিজীবীরা আসবে, সাথে tvলোকেরা। একটু ভাল সাজতে হবে না, যদি টিভিতে দেখায় ওকে।

ওদিকে মাস্টার তখনও বলে চলেছে, সীমা লঙঘনটাই বাকি বুঝলি দীনু, ওটাই শুধু বাকি...


n.b:
সব চরিত্র কাল্পনিক নয়,
বরুন বিশ্বাস কে জানতে হলে নাম দিয়ে Google search করুন।

Comments

  1. রূপকের ব্যবহার বাংলা ছোটোগল্পে ইদানিং দেখিনা। তার ওপর অনুগল্প। কাল্পনিক চরিত্র দেখি, কিন্তু রূপক নয়। এই অনুগল্পে অনেক দিন পর খাঁটি রূপক দেখে মন ভরে গেল। বেড়ে লেখা। কেয়াবাত।

    ReplyDelete
  2. sesh hoiyao hoilo na sesh...

    ReplyDelete
  3. Besh bhalo.. Simar langhan hobei.. Ei biswas tuku chhoranotai somoyer dabi. Galpe kobitay natoke jara ei somoyta dhorte pare, tader selam..

    ReplyDelete
  4. besh bhaalo laaglo......aro beshi onugolpo expect korbo

    ReplyDelete
  5. ভালো লাগল এই রূপক মোড়া অনু গল্প

    ReplyDelete
  6. ভালো লাগল এই রূপক মোড়া অনু গল্প

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

Of rooftops and marriages...

1 year - a journey worth writing about…(this blog was written by me and officially posted in Cognizant blogs)..